سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا
ইসরা ও মিরাজ: এক রাতে আসমানের সফর আর নামাজের উপহার
পৃথিবীর মানুষ যখন দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল, আল্লাহ তাঁর বান্দার জন্য খুলে দিলেন আসমানের দরজা। এক রাতের সফরে তিনি দেখলেন নবীদের, জান্নাত, আর নিয়ে এলেন উম্মতের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার: নামাজ।
সীরাত · মক্কী যুগ৬২০/৬২১ খ্রি. · হিজরতের আগে (তারিখে মতভেদ)
- কখন
- হিজরতের আগে, মক্কায়; বছর ও তারিখ নিয়ে অনেক মত, কোনোটিই সহিহ হাদিসে নির্দিষ্ট নয়
- কোথায়
- মসজিদুল হারাম থেকে বায়তুল মাকদিস (ইসরা), সেখান থেকে সাত আসমান (মিরাজ)
- কারা
- নবীজি (ﷺ), জিবরীল (আ.), আসমানে আদম, ইয়াহইয়া, ঈসা, ইউসুফ, ইদরীস, হারূন, মূসা ও ইবরাহীম (আ.)
- এই গল্পে
- বুক ধোয়া থেকে ভোরে মক্কায় ফিরে কুরাইশকে জানানো পর্যন্ত
কেন পড়বেন: যে নামাজ আমরা প্রতিদিন পড়ি, তা কোনো ফেরেশতার হাতে পাঠানো হয়নি; আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নিজের কাছে ডেকে দিয়েছেন। এই গল্প পড়লে নামাজকে আর বোঝা মনে হবে না, মনে হবে আসমান থেকে আসা উপহার।
গল্প
বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।
- ১
হিজরতের আগে, এক রাত
দুঃখের পরে আসমানের ডাক
দুঃখের বছর আর তায়েফের পাথরের পর এল এক অসাধারণ রাত। আল্লাহ কুরআনে এর শুরু বলেছেন এভাবে:
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا ۚ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে ত্ৰমণ করালেন, আল-মসজিদুল হারাম থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমরা দিয়েছি বরকত, যেন আমরা তাকে আমাদের নিদর্শন দেখাতে পারি; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
সেই রাতে নবীজি (ﷺ) কোথায় ছিলেন, তা নিয়ে সহিহ বর্ণনায় দুই রকম কথা আছে: এক বর্ণনায় কাবার হাতীমে শুয়ে ছিলেন (সহিহ বুখারী ৩৮৮৭), আরেকটিতে মক্কায় নিজের ঘরে (সহিহ বুখারী ৩৪৯)। আর বছর বা মাস নিয়ে সীরাতবিদদের অনেক মত, ইবনে কাসীর ও ইবনে হাজার সেগুলো উল্লেখ করেছেন; কোনো সহিহ হাদিসে তারিখ নির্দিষ্ট নেই।
সূত্রসূরা আল-ইসরা ১৭:১ কুরআনসহিহ বুখারী ৩৮৮৭ সহিহসহিহ বুখারী ৩৪৯ সহিহইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ইসরার সময় নিয়ে মতগুলো ঐতিহাসিক বর্ণনা
তারিখ জানা নেই, কিন্তু শিক্ষা জানা আছে। আল্লাহ আমাদের তারিখ মনে রাখতে বলেননি, বলেছেন নামাজ ধরে রাখতে।
- ২
সফরের শুরু
বুক ধোয়া আর বুরাক
নবীজি (ﷺ) নিজে বলেছেন: জিবরীল এসে তাঁর বুক খুললেন, যমযমের পানি দিয়ে ধুলেন, তারপর ঈমান আর হিকমতে ভরা সোনার পাত্র এনে বুকে ঢেলে দিয়ে বন্ধ করলেন (সহিহ বুখারী ৩৪৯)।
তারপর আনা হলো এক সাদা বাহন, খচ্চরের চেয়ে ছোট আর গাধার চেয়ে বড়, নাম বুরাক। তার প্রতিটি পদক্ষেপ পড়ত দৃষ্টির শেষ সীমায় (সহিহ বুখারী ৩৮৮৭)।
সূত্রসহিহ বুখারী ৩৪৯ সহিহসহিহ বুখারী ৩৮৮৭ সহিহসহিহ মুসলিম ১৬২ (আনাস রা.; প্রথম বর্ণনা): বুরাক, বায়তুল মাকদিসে দুই রাকাত, দুধ ও মদের পাত্র সহিহ
আসমানের সফরের আগে হৃদয় পরিষ্কার করা হলো। আল্লাহর কাছে যেতে হলে আগে হৃদয় ধুতে হয়।
- ৩
ইসরা
বায়তুল মাকদিসে নবীদের ইমাম
বুরাকে চড়ে তিনি পৌঁছালেন বায়তুল মাকদিসে। বুরাক বাঁধলেন সেই আংটায়, যেখানে নবীরা বাহন বাঁধতেন, তারপর মসজিদে দুই রাকাত নামাজ পড়লেন। জিবরীল দুটি পাত্র আনলেন, একটিতে মদ, একটিতে দুধ। তিনি দুধ বেছে নিলেন; জিবরীল বললেন: আপনি ফিতরাত (স্বভাবধর্ম) বেছে নিয়েছেন।
সেখানে তিনি নবীদের এক জামাআত দেখলেন:
(নবীজি বললেন:) আমি নিজেকে নবীদের এক জামাআতে দেখলাম। দেখি মূসা দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন, শানুআ গোত্রের লোকদের মতো দীর্ঘদেহী, কোঁকড়ানো চুল। আর ঈসা ইবনু মারইয়াম দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন, তাঁর সাথে সবচেয়ে বেশি মিল উরওয়া ইবনু মাসউদ আস-সাকাফীর। আর ইবরাহীম দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছেন, তাঁর সাথে সবচেয়ে বেশি মিল তোমাদের এই সাথীর (অর্থাৎ নবীজির নিজের)। তারপর নামাজের সময় হলো, আর আমি তাঁদের ইমামতি করলাম।
সূত্রসহিহ মুসলিম ১৬২ (আনাস রা.; প্রথম বর্ণনা): বুরাক, বায়তুল মাকদিসে দুই রাকাত, দুধ ও মদের পাত্র সহিহসহিহ মুসলিম ১৭২ সহিহ
সব নবী এক কাতারে, আর ইমাম মুহাম্মাদ (ﷺ)। সব নবীর দ্বীন একই: এক আল্লাহর ইবাদত।
- ৪
মিরাজ
সাত আসমান, সাত সাক্ষাৎ
তারপর জিবরীল তাঁকে নিয়ে উঠলেন আসমানে। প্রতিটি আসমানের দরজায় জিজ্ঞেস করা হতো: কে? সাথে কে? তাঁকে কি ডাকা হয়েছে? তারপর দরজা খুলত আর স্বাগত জানানো হতো। প্রথম আসমানে আদম (আ.), যিনি বললেন: স্বাগতম, নেককার পুত্র ও নেককার নবী। তারপর:
(দ্বিতীয় আসমানে) পৌঁছে দেখি ইয়াহইয়া ও ঈসা (আ.), তাঁরা দুজন খালাতো ভাই। জিবরীল বললেন: ইনি ইয়াহইয়া আর ইনি ঈসা, তাঁদের সালাম দিন। আমি সালাম দিলাম, তাঁরা উত্তর দিয়ে বললেন: নেককার ভাই ও নেককার নবীকে স্বাগতম। ... (চতুর্থ আসমানে) পৌঁছালাম ইদরীস (আ.)-এর কাছে। জিবরীল বললেন: ইনি ইদরীস, তাঁকে সালাম দিন। আমি সালাম দিলাম, তিনি উত্তর দিয়ে বললেন: নেককার ভাই ও নেককার নবীকে স্বাগতম। ... (পঞ্চম আসমানে) দেখি হারূন (আ.)। জিবরীল বললেন: ইনি হারূন, তাঁকে সালাম দিন। আমি সালাম দিলাম, তিনি উত্তর দিয়ে বললেন: নেককার ভাই ও নেককার নবীকে স্বাগতম। ... (সপ্তম আসমানে) দেখি ইবরাহীম (আ.)। জিবরীল বললেন: ইনি আপনার পিতা, তাঁকে সালাম দিন। আমি সালাম দিলাম, তিনি উত্তর দিয়ে বললেন: নেককার সন্তান ও নেককার নবীকে স্বাগতম।
তৃতীয় আসমানে ছিলেন ইউসুফ (আ.), যাঁকে সৌন্দর্যের অর্ধেক দেওয়া হয়েছে (সহিহ মুসলিম ১৬২)। ষষ্ঠ আসমানে মূসা (আ.) নবীজিকে (ﷺ) পার হতে দেখে কাঁদলেন: আমার পরে পাঠানো এক যুবক, যাঁর উম্মত আমার উম্মতের চেয়ে বেশি জান্নাতে যাবে। আর সপ্তম আসমানে ইবরাহীম (আ.), বায়তুল মামুরে হেলান দিয়ে বসা, যেখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে, আর একবার যারা যায়, তারা আর ফেরার সুযোগ পায় না (সহিহ মুসলিম ১৬২)।
সূত্রসহিহ বুখারী ৩৮৮৭ সহিহসহিহ মুসলিম ১৬২ সহিহসহিহ মুসলিম ১৬২ (আনাস রা.; প্রথম বর্ণনা): বুরাক, বায়তুল মাকদিসে দুই রাকাত, দুধ ও মদের পাত্র সহিহ
প্রতিটি নবী তাঁকে "ভাই" বা "পুত্র" বলে স্বাগত জানালেন। নবীদের পরিবার এক, আমরা সেই পরিবারের উত্তরাধিকারী।
- ৫
সপ্তম আসমানের ওপারে
সিদরাতুল মুনতাহা
তারপর তাঁকে তোলা হলো সিদরাতুল মুনতাহায়, শেষ সীমার কুলগাছ। এর ফল ছিল হাজার অঞ্চলের বড় মটকার মতো, পাতা হাতির কানের মতো; এর গোড়া থেকে বেরিয়েছে চারটি নদী (সহিহ বুখারী ৩৮৮৭)। গাছটিকে ঢেকে দিয়েছিল এমন সব রং, যা তিনি বর্ণনা করতে পারেননি; তারপর তাঁকে জান্নাতে নেওয়া হলো, যার মাটি মিশকের (সহিহ বুখারী ৩৪৯)।
কুরআন এই দৃশ্যের কথা বলেছে:
সেখানে তিনি জিবরীলকে (আ.) তাঁর আসল রূপে দ্বিতীয়বার দেখেছেন, আর দেখেছেন রবের বড় বড় নিদর্শন (সূরা আন-নাজম ৫৩:১৮)।عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَىٰ
‘সিদরাতুল মুন্তাহা’ তথা প্রান্তবর্তী কুল গাছ এর কাছে,
সূত্রসহিহ বুখারী ৩৮৮৭ সহিহসহিহ বুখারী ৩৪৯ সহিহসূরা আন-নাজম ৫৩:১৪ কুরআনসূরা আন-নাজম ৫৩:১৮ কুরআন
যেখানে জিবরীলও থেমে যান, সেখান পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর বান্দাকে নিয়ে গেছেন। আর আল্লাহ তাঁকে কুরআনে ডেকেছেন "তাঁর বান্দা" বলে।
- ৬
ফেরার আগে
পঞ্চাশ থেকে পাঁচ
সেখানেই আল্লাহ উম্মতের উপর নামাজ ফরজ করলেন। নবীজি (ﷺ) বলেছেন:
(নবী ﷺ বলেন:) আল্লাহ আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন। আমি তা নিয়ে ফেরার পথে মূসা (আ.)-এর কাছ দিয়ে গেলাম। তিনি বললেন: আল্লাহ আপনার উম্মতের উপর কী ফরজ করেছেন? আমি বললাম: পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ। তিনি বললেন: আপনার রবের কাছে ফিরে যান, আপনার উম্মত এটা পারবে না। আমি ফিরে গেলাম, তিনি এর একটা অংশ কমিয়ে দিলেন। ... এভাবে কয়েকবার যাওয়ার পর আল্লাহ বললেন: এগুলো পাঁচ, আর এগুলোই পঞ্চাশ। আমার কাছে কথা বদলায় না।
আরেক বর্ণনায় আছে, শেষে নবীজি (ﷺ) বললেন: আমি রবের কাছে এতবার চেয়েছি যে লজ্জা লাগছে, এখন আমি রাজি আর মেনে নিলাম। তখন এক ঘোষক বললেন: আমি আমার ফরজ চূড়ান্ত করলাম, আর বান্দাদের জন্য সহজ করে দিলাম (সহিহ বুখারী ৩৮৮৭)।
সূত্রসহিহ বুখারী ৩৪৯ সহিহসহিহ বুখারী ৩৮৮৭ সহিহ
পাঁচ ওয়াক্ত পড়লে পঞ্চাশের সওয়াব। পাঁচটুকুও যদি না পড়ি, তাহলে এই উপহারের কী কদর করলাম?
- ৭
পরদিন সকাল
ভোরে মক্কায়: কে বিশ্বাস করবে?
সকালে নবীজি (ﷺ) এই সফরের কথা কুরাইশকে বললেন। যারা জানত, মক্কা থেকে বায়তুল মাকদিস যেতেই কাফেলার এক মাস লাগে, তারা হাসাহাসি শুরু করল, আর পরীক্ষা নিতে বায়তুল মাকদিসের খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করল:
لَمَّا كَذَّبَنِي قُرَيْشٌ قُمْتُ فِي الْحِجْرِ، فَجَلاَ اللَّهُ لِي بَيْتَ الْمَقْدِسِ، فَطَفِقْتُ أُخْبِرُهُمْ عَنْ آيَاتِهِ وَأَنَا أَنْظُرُ إِلَيْهِ
যখন কুরাইশ (ইসরার ঘটনায়) আমাকে মিথ্যাবাদী বলল, আমি হিজরে দাঁড়ালাম। আল্লাহ আমার সামনে বায়তুল মাকদিসকে স্পষ্ট করে তুলে ধরলেন, আর আমি সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তাদের এর নিদর্শনগুলো বলতে লাগলাম।
এটা স্বপ্ন ছিল না, চোখে দেখা ছিল (সহিহ বুখারী ৩৮৮৮)। কিছু দুর্বল ঈমানের মানুষ এই খবরে ফিরে গেল। কেউ গিয়ে আবু বকরকে (রা.) বলল: তোমার সাথী কী বলছে শোনো! তিনি বললেন:
তিনি যদি বলে থাকেন, তাহলে সত্যই বলেছেন।
সেদিন থেকে তাঁর উপাধি আস-সিদ্দীক।সূত্রসহিহ বুখারী ৩৮৮৬ সহিহসহিহ বুখারী ৩৮৮৮ সহিহমুস্তাদরাকে হাকিম (আয়িশা রা.): আবু বকরের (রা.) "সিদ্দীক" উপাধি; আলবানী: সহিহ (সিলসিলা সহিহা) হাসান
আবু বকর (রা.) বায়তুল মাকদিস দেখেননি, আসমানও দেখেননি। তিনি শুধু জানতেন, এই মানুষটি কখনো মিথ্যা বলেন না।
প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়
এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।
প্রমাণিত নয় ২৭ রজবই শবে মিরাজ, আর সে রাতে বিশেষ নামাজ ও পরদিন রোজার বিশেষ ফজিলত
ইসরা ও মিরাজের তারিখ কোনো সহিহ হাদিসে নেই; সীরাতবিদদের মধ্যে রজব, রবিউল আউয়াল, রমজানসহ বহু মত আছে, আর ইবনে কাসীর ও ইবনে হাজার সেগুলো উল্লেখ করেছেন। সাহাবিরা এই রাত আলাদা করে পালন করেছেন, এমনও প্রমাণ নেই। তাই নির্দিষ্ট রাতে বিশেষ নামাজ বা রোজাকে সুন্নাহ মনে করা ঠিক নয়। মিরাজের আসল শিক্ষা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ (সহিহ বুখারী ৩৪৯)।
ভিত্তিহীন নবীজি (ﷺ) জুতা পায়ে আরশে উঠেছিলেন
কোনো হাদিসগ্রন্থে এর সনদ পাওয়া যায় না; আলেমরা একে বানানো কথা বলেছেন। মিরাজের সহিহ বর্ণনায় সিদরাতুল মুনতাহা আর জান্নাতের কথা আছে (সহিহ বুখারী ৩৪৯, সহিহ বুখারী ৩৮৮৭), আরশে ওঠার কোনো কথা নেই।
মতভেদ মিরাজে নবীজি (ﷺ) আল্লাহকে চোখে দেখেছেন
এ নিয়ে সাহাবিদের যুগ থেকেই মতভেদ। আয়িশা (রা.) কঠোরভাবে অস্বীকার করেছেন (সহিহ বুখারী ৪৮৫৫)। আবু যার (রা.) জিজ্ঞেস করলে নবীজি (ﷺ) বলেছিলেন: নূর, আমি কীভাবে দেখব (সহিহ মুসলিম ১৭৮)। ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি অন্তর দিয়ে দেখেছেন (সহিহ মুসলিম ১৭৬)। তাই "চোখে দেখেছেন" কথাটি নিশ্চিত করে বলা ঠিক নয়।
ভুল ধারণা মিরাজ ছিল শুধু স্বপ্ন বা আত্মিক সফর
ইবনু আব্বাস (রা.) বলেছেন, এটা ছিল চোখে দেখা (সহিহ বুখারী ৩৮৮৮)। স্বপ্ন হলে কুরাইশ উপহাস করত না, কেউ ঈমান হারাত না। কুরআনও বলেছে "তাঁর বান্দাকে" নিয়ে গেছেন (সূরা আল-ইসরা ১৭:১), অর্থাৎ শরীর আর রূহ দুটোই।
এই গল্প থেকে আমার জীবনে
গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।
নামাজ: আসমান থেকে আসা উপহার
সব বিধান জমিনে নাজিল হয়েছে, নামাজ ফরজ হয়েছে আসমানে, আল্লাহ রাসূলকে নিজের কাছে ডেকে দিয়েছেন।
আজকের কাজ: যে ওয়াক্তটি সবচেয়ে বেশি কাজা হয় (প্রায়ই ফজর), আজ থেকে সেটা সময়মতো পড়ার জন্য অ্যালার্ম আর নিয়ত দুটোই ঠিক করুন।
সহিহ বুখারী ৩৪৯ সহিহসূরা আল-ইসরা ১৭:৭৮ কুরআন
না দেখেও বিশ্বাস
আবু বকর (রা.) কিছু না দেখেই বললেন: তিনি বলে থাকলে সত্যই বলেছেন। মুত্তাকীদের প্রথম গুণ গায়েবে বিশ্বাস।
আজকের কাজ: কুরআন বা সহিহ হাদিসের যে কথা বিবেকে বুঝতে কষ্ট হয়, আজ তা নিয়ে তর্ক না করে আগে বিশ্বাসের জায়গাটা শক্ত করুন, তারপর জানার চেষ্টা করুন।
সূরা আল-বাকারা ২:৩ কুরআন
ফিতরাতের পথ বেছে নেওয়া
দুধ আর মদের মধ্যে নবীজি (ﷺ) দুধ বেছে নিয়েছিলেন, আর জিবরীল বললেন: আপনি ফিতরাত বেছে নিয়েছেন।
আজকের কাজ: যে অভ্যাস বা নেশা (ধূমপান, অশ্লীল কনটেন্ট, অতিরিক্ত স্ক্রিন) আপনার স্বভাবকে নষ্ট করছে, আজ তা কমানোর একটা বাস্তব পদক্ষেপ নিন।
সহিহ মুসলিম ১৬২ (আনাস রা.; প্রথম বর্ণনা): বুরাক, বায়তুল মাকদিসে দুই রাকাত, দুধ ও মদের পাত্র সহিহ
কষ্টের পরে সম্মানের আশা
তায়েফের অপমানের পরেই এল মিরাজের সম্মান। আল্লাহ বলেছেন, কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি।
আজকের কাজ: আজ নিজের কোনো কষ্টের দিনের কথা মনে করে লিখে রাখুন, তারপর আল্লাহ কী কী সহজ করে দিয়েছেন। শুকরিয়া আদায় করুন।
সূরা আশ-শারহ ৯৪:৫ কুরআনসূরা আদ-দুহা ৯৩:৫ কুরআন
মসজিদুল আকসার প্রতি ভালোবাসা
আল্লাহ মসজিদুল আকসার চারপাশকে বরকতময় বলেছেন, আর সেখানেই নবীজি (ﷺ) সব নবীর ইমাম হয়েছিলেন।
আজকের কাজ: আজ নামাজের পর মসজিদুল আকসা আর ফিলিস্তিনের মুসলিমদের জন্য নাম ধরে দোয়া করুন।
সূরা আল-ইসরা ১৭:১ কুরআন
আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নিজের কাছে ডেকে আমাদের জন্য নামাজ উপহার দিয়েছেন, পঞ্চাশ থেকে কমিয়ে পাঁচ করেছেন। গত সাত দিনে এই পাঁচটির কয়টি আপনি সময়মতো পড়েছেন?
সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
- কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
- সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
- ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
- মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
- দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।
সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।