deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

ইমাম পরিচিতি · কুতুবে সিত্তাহ

ইমাম বুখারী

محمد بن إسماعيل البخاري

আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদিস, সহিহ বুখারীর সংকলক

আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল ইবনি ইবরাহীম ইবনিল মুগীরা আল-জুফী আল-বুখারী

ছোটবেলায় বাবাকে হারানো এক ছেলে, দশ বছর বয়সে হাদিস মুখস্থ শুরু করে, ষোলো বছর খেটে যিনি এমন একটি গ্রন্থ লিখেছেন যাকে উম্মাহ কুরআনের পরে সবচেয়ে বিশুদ্ধ কিতাব বলে মেনে নিয়েছে।

জন্ম
১৩ শাওয়াল ১৯৪ হিজরি, জুমাবার (৮১০ খ্রি.)
জন্মস্থান
বুখারা · আজকের উজবেকিস্তান
মৃত্যু
ঈদুল ফিতরের রাত, ১ শাওয়াল ২৫৬ হিজরি (৮৭০ খ্রি.)
কোথায়
খারতাংক, সমরকন্দের কাছে একটি গ্রাম
বয়স
৬২ বছরের ১৩ দিন কম
প্রধান গ্রন্থ
সহিহ বুখারী (আল-জামিউস সহিহ) الجامع الصحيح

পরিবার ও শৈশব

তাঁর পূর্বপুরুষ বারদিযবাহ ছিলেন পারস্যের অগ্নিপূজক। তাঁর ছেলে মুগীরা বুখারার শাসক ইয়ামান আল-জুফীর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন, তাই নামের শেষে "আল-জুফী" (সিয়ার, খণ্ড ১২)। বাবা ইসমাঈল নিজেও মুহাদ্দিস ছিলেন, ইমাম মালিক ও হাম্মাদ ইবনু যাইদের কাছে হাদিস শুনেছেন; ইমাম বুখারী তাঁর আত-তারীখুল কাবীরে বাবার কথা লিখেছেন। বাবা অল্প বয়সে মারা যান। মা তাঁকে ও বড় ভাই আহমাদকে বড় করেন।

জ্ঞানের খোঁজে সফর

তিনি নিজে বলেছেন, মক্তবে থাকতেই দশ বছর বা তার কম বয়সে হাদিস মুখস্থের আগ্রহ জাগে। ষোলো বছর বয়সে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক ও ওয়াকীর বই মুখস্থ করে ফেলেন (তাঁর লেখক মুহাম্মাদ ইবনু আবী হাতিমের বর্ণনা; তারীখে বাগদাদ, সিয়ার, খণ্ড ১২)।

২১০ হিজরিতে মা ও ভাইয়ের সাথে হজে যান, ভাই ফিরে আসেন, তিনি জ্ঞানের জন্য থেকে যান। আঠারো বছর বয়সে মদিনায় নবীজির (ﷺ) কবরের পাশে চাঁদনী রাতে আত-তারীখুল কাবীর লেখেন। এরপর শাম, মিসর, জাযীরা, বসরা, কূফা ও বাগদাদ ঘুরেছেন। তিনি বলেছেন: "আমি ১,০৮০ জনের কাছ থেকে লিখেছি, তাঁরা সবাই হাদিসের লোক" (হাদইউস সারী; সিয়ার, খণ্ড ১২)।

শিক্ষক

  • মাক্কী ইবনু ইবরাহীম
  • আবু আসিম আন-নাবীল
  • ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল
  • আলী ইবনুল মাদীনী
  • ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন
  • ইসহাক ইবনু রাহাওয়াইহ
  • আল-হুমাইদী

ছাত্র

  • ইমাম মুসলিম
  • ইমাম তিরমিযী
  • ইবনু খুযাইমা
  • মুহাম্মাদ ইবনু ইউসুফ আল-ফিরাবরী (সহিহ বুখারীর প্রধান বর্ণনাকারী)

যেভাবে কাজ করেছেন

  1. ১
    কেন শুরু

    শিক্ষক ইসহাক ইবনু রাহাওয়াইহ একদিন বললেন, কেউ যদি নবীজির (ﷺ) সুন্নাহর শুধু সহিহ হাদিস নিয়ে একটা সংক্ষিপ্ত বই লিখত! কথাটা তাঁর মনে বসে যায় (ইবরাহীম ইবনু মাকিলের বর্ণনা; হাদইউস সারী)।

  2. ২
    বিশাল ভাণ্ডার থেকে বাছাই

    তিনি বলেছেন: "ছয় লাখ হাদিস থেকে বেছে এই বই লিখেছি, সময় লেগেছে ষোলো বছর" (তারীখে বাগদাদ)। এখানে "হাদিস" মানে একই কথার আলাদা আলাদা সনদও, তাই সংখ্যা এত বড়। শেষে বইটি আহমাদ ইবনু হাম্বাল, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন ও আলী ইবনুল মাদীনীকে দেখান; তাঁরা চারটি হাদিস ছাড়া সবগুলোকে সহিহ বলেন, আর আল-উকাইলী বলেছেন সেই চারটিতেও বুখারীর কথাই সঠিক (হাদইউস সারী)।

  3. ৩
    কঠিন শর্ত

    বর্ণনাকারী হতে হবে ন্যায়পরায়ণ ও মুখস্থে পাকা, সনদের কোথাও ফাঁক থাকবে না, আর শিক্ষক ও ছাত্রের অন্তত একবার সাক্ষাৎ প্রমাণিত হতে হবে। শুধু একই যুগে থাকা যথেষ্ট নয়।

  4. ৪
    ইবাদতের সাথে লেখা

    আল-ফিরাবরী তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন: "প্রতিটি হাদিস লেখার আগে আমি গোসল করে দুই রাকাত নামাজ পড়েছি" (তারীখে বাগদাদ; হাদইউস সারী)।

  5. ৫
    অধ্যায়ের শিরোনামে ফিকহ

    প্রতিটি অধ্যায়ের নাম (তারজামাতুল বাব) তিনি এমনভাবে দিয়েছেন যে নাম পড়লেই হাদিস থেকে কোন শিক্ষা নিচ্ছেন বোঝা যায়। আলেমরা বলেন: "বুখারীর ফিকহ তাঁর শিরোনামে।"

তাঁর গ্রন্থ: সহিহ বুখারী (আল-জামিউস সহিহ)

পুরো নাম: আল-জামিউল মুসনাদুস সহীহুল মুখতাসার মিন উমূরি রাসূলিল্লাহি ﷺ ওয়া সুনানিহী ওয়া আইয়ামিহী। এতে ৯৭টি "কিতাব" (বড় অধ্যায়), শুরু অহীর সূচনা দিয়ে, শেষ তাওহীদ দিয়ে।

সংখ্যা: ফাতহুল বারী ও মুহাম্মাদ ফুআদ আব্দুল বাকীর নম্বরে পুনরাবৃত্তিসহ ৭,৫৬৩টি। একই হাদিস ভিন্ন শিক্ষার জন্য ভিন্ন অধ্যায়ে আবার এসেছে; পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে ইবনু হাজারের গণনায় প্রায় ২,৬০২টি মুসনাদ হাদিস (হাদইউস সারী)।

যেভাবে আমাদের কাছে এলো: তাঁর ছাত্র আল-ফিরাবরী বলেছেন, প্রায় নব্বই হাজার মানুষ ইমাম বুখারীর কাছে সরাসরি এই বই শুনেছেন। আজকের ছাপা কপিগুলো মূলত আল-ফিরাবরীর বর্ণনা থেকে।

তাঁর অন্য বই: আল-আদাবুল মুফরাদ, আত-তারীখুল কাবীর, খালকু আফআলিল ইবাদ, জুযউ রাফইল ইয়াদাইন।

এই সাইটে সহিহ বুখারীর ৩৭৫টি হাদিসসবগুলো দেখুন: সূত্র তালিকা

পরীক্ষা ও শেষ জীবন

২৫০ হিজরির দিকে নিশাপুরে "কুরআন তিলাওয়াতের শব্দ সৃষ্ট কি না" প্রশ্ন নিয়ে বিরোধ বাধে। তিনি স্পষ্ট বলেন: কুরআন আল্লাহর কালাম, সৃষ্ট নয়; আর বান্দার কাজ সৃষ্ট। তবু ভুল বোঝাবুঝিতে তাঁকে নিশাপুর ছাড়তে হয়। ইমাম মুসলিম তখনও তাঁর পাশে ছিলেন (সিয়ার, খণ্ড ১২)।

নিজের শহর বুখারায় ফিরলে শাসক খালিদ ইবনু আহমাদ চান, তিনি প্রাসাদে এসে শাসকের সন্তানদের আলাদা করে পড়াবেন। তিনি বলেন, "আমি জ্ঞানকে অপমান করব না, যে শিখতে চায় সে মসজিদে আসুক।" এর জেরে তাঁকে শহর থেকে বের করে দেওয়া হয়। তিনি সমরকন্দের কাছে খারতাংক গ্রামে আত্মীয়দের কাছে যান, সেখানেই ঈদুল ফিতরের রাতে ইন্তেকাল করেন; ঈদের দিন যোহরের পর দাফন হয় (সিয়ার, খণ্ড ১২)।

আলেমদের চোখে

ইরাক ও খোরাসানে হাদিসের দোষ-ত্রুটি, ইতিহাস ও সনদ বিষয়ে মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলের চেয়ে বেশি জানেন, এমন কাউকে আমি দেখিনি।

ইমাম তিরমিযী · জামে তিরমিযী, শেষে কিতাবুল ইলাল

আকাশের নিচে রাসূলুল্লাহর (ﷺ) হাদিস মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলের চেয়ে বেশি জানেন ও বেশি মুখস্থ রাখেন, এমন কাউকে আমি দেখিনি।

ইবনু খুযাইমা · তারীখে বাগদাদ; সিয়ার, খণ্ড ১২

খোরাসান মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলের মতো কাউকে জন্ম দেয়নি।

ইমাম আহমাদ · তারীখে বাগদাদ; সিয়ার, খণ্ড ১২

জীবনের সময়রেখা

হিজরিখ্রিস্টাব্দঘটনাসূত্র
১৯৪৮১০বুখারায় জন্মসিয়ার, খণ্ড ১২
২০৪-২০৫৮২০দশ বছর বয়সে হাদিস মুখস্থ শুরুতারীখে বাগদাদ; সিয়ার, খণ্ড ১২
২১০৮২৫মা ও ভাইয়ের সাথে হজ, জ্ঞানের জন্য হিজাযে থেকে যাওয়াসিয়ার, খণ্ড ১২
২১২৮২৭মদিনায় আত-তারীখুল কাবীর লেখা (১৮ বছর বয়সে)সিয়ার, খণ্ড ১২
২৩৩-এর আগে৮৪৮-এর আগেষোলো বছরে সহিহ সংকলন; শেষে আহমাদ, ইবনু মাঈন (মৃ. ২৩৩) ও ইবনুল মাদীনীকে দেখানআল-উকাইলীর বর্ণনা, হাদইউস সারী
২৫০৮৬৪নিশাপুরে আগমন ও পরীক্ষাসিয়ার, খণ্ড ১২
২৫৬৮৭০খারতাংকে ইন্তেকালসিয়ার, খণ্ড ১২

প্রচলিত গল্প: কতটা নিশ্চিত

সনদে অজ্ঞাত বর্ণনাকারী

বাগদাদের আলেমরা ১০০টি হাদিসের সনদ উল্টেপাল্টে তাঁকে পরীক্ষা করেন; তিনি সবগুলো ঠিক করে দেন।

যা জানা যায়: গল্পটি ইবনু আদী বর্ণনা করেছেন "কয়েকজন শায়খের কাছে শুনেছি" বলে, শায়খদের নাম নেই (তারীখে বাগদাদ)। তাই নিশ্চিত বলা যায় না। তাঁর অসাধারণ মুখস্থশক্তির কথা অবশ্য বহু নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় আছে।
সনদ নিয়ে আলোচনা আছে

ছোটবেলায় তিনি অন্ধ হয়ে যান, মায়ের দোয়ায় চোখ ফিরে পান।

যা জানা যায়: ঘটনাটি আল-লালকাঈ (কারামাতুল আওলিয়া) ও গুনজার বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর পক্ষে এটা অসম্ভব নয়, কিন্তু সনদ পরিষ্কার নির্ভরযোগ্য না হওয়ায় আমরা এটাকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দিচ্ছি না।

মুহাদ্দিসদের নিয়মে সনদ না মিললে গল্পটি যত সুন্দরই হোক, নিশ্চিত তথ্য হিসেবে লেখা হয় না।

সূত্র

  1. যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা
    খণ্ড ১২, পৃ. ৩৯১ থেকে
  2. খতীব বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ
    মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈলের জীবনী
  3. ইবনু হাজার, হাদইউস সারী (ফাতহুল বারীর ভূমিকা)
    শেষ অংশে ইমাম বুখারীর জীবনী ও সহিহের সংখ্যা
  4. মিযযী, তাহযীবুল কামাল
    মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল অধ্যায়
  5. তিরমিযী, কিতাবুল ইলাল (জামে তিরমিযীর শেষে)
    ইমাম বুখারী সম্পর্কে তিরমিযীর সাক্ষ্য

সিয়ারের খণ্ড ও পৃষ্ঠা মুআসসাসাতুর রিসালাহ সংস্করণ অনুযায়ী। হাদিসের সংখ্যা সংস্করণ ও গণনার ধরনভেদে কিছুটা আলাদা হয়; কোন সংস্করণের সংখ্যা, তা পাশে লেখা। জন্মসাল বা মৃত্যুস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলে দুই মতই দেওয়া হয়েছে। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান, সূত্রসহ সংশোধন করা হবে। আরও দেখুন: সূত্র নীতি।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/sutro/imam/bukhari/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার