ইমাম পরিচিতি · কুতুবে সিত্তাহ
ইমাম মুসলিম
مسلم بن الحجاج
নিশাপুরের হাফিয, সহিহ মুসলিমের সংকলক
আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ ইবনি মুসলিম আল-কুশাইরী আন-নাইসাবূরী
আরবের কুশাইর গোত্রের এই আলেম পনেরো বছর খেটে এমন একটি সহিহ গ্রন্থ লিখেছেন, যেখানে একটি হাদিসের সব সনদ এক জায়গায় সাজানো; সহিহ বুখারীর পরেই এর স্থান।
- জন্ম
- ২০৪ হিজরি (কারো মতে ২০৬) (৮১৯-৮২১ খ্রি.)
- জন্মস্থান
- নিশাপুর (খোরাসান) · আজকের ইরান
- মৃত্যু
- ২৫ রজব ২৬১ হিজরি, রবিবার সন্ধ্যা (৮৭৫ খ্রি.)
- কোথায়
- নাসরাবাদ, নিশাপুরের পাশে
- বয়স
- ৫৫ থেকে ৫৭ বছর
- প্রধান গ্রন্থ
- সহিহ মুসলিম المسند الصحيح
পরিবার ও শৈশব
"আল-কুশাইরী" মানে আরবের বনু কুশাইর গোত্রের, আর "আন-নাইসাবূরী" মানে নিশাপুরের মানুষ। নিশাপুর তখন খোরাসানের বড় জ্ঞানকেন্দ্র, আজ ইরানের উত্তর-পূর্বে। তিনি ব্যবসা করে জীবিকা চালাতেন বলে বর্ণিত, নিশাপুরে তাঁর সম্পত্তি ছিল; তাই কারো ওপর নির্ভর না করেই জ্ঞানচর্চা করতে পেরেছেন (সিয়ার, খণ্ড ১২)।
জ্ঞানের খোঁজে সফর
২১৮ হিজরিতে, প্রায় চৌদ্দ বছর বয়সে, ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়ার কাছে প্রথম হাদিস শোনেন (সিয়ার, খণ্ড ১২)। এরপর হজে গিয়ে হিজাযের আলেমদের কাছে শেখেন, তারপর ইরাক, শাম ও মিসরে সফর করেন; বাগদাদে বহুবার গেছেন।
২৫০ হিজরিতে ইমাম বুখারী নিশাপুরে এলে তিনি তাঁর সঙ্গ ছাড়েননি। বুখারীকে নিয়ে বিরোধ বাধলে তিনি বিরোধীপক্ষের শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াহইয়া আয-যুহলীর মজলিস ছেড়ে দেন, আর তাঁর কাছ থেকে লেখা সব কাগজ ফেরত পাঠান (তারীখে বাগদাদ; সিয়ার, খণ্ড ১২)।
শিক্ষক
- ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া আন-নাইসাবূরী (প্রথম শিক্ষক)
- কুতাইবা ইবনু সাঈদ
- ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল
- ইসহাক ইবনু রাহাওয়াইহ
- আবু বকর ইবনু আবী শাইবা
- আব্দুল্লাহ ইবনু মাসলামা আল-কানাবী
- ইমাম বুখারী (সঙ্গ ও শিক্ষা)
ছাত্র
- ইমাম তিরমিযী
- ইবনু খুযাইমা
- আবু আওয়ানা
- ইবরাহীম ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু সুফিয়ান (সহিহ মুসলিমের প্রধান বর্ণনাকারী)
যেভাবে কাজ করেছেন
- ১বাছাই
তিনি বলেছেন: "নিজে শোনা তিন লাখ হাদিস থেকে বেছে এই সহিহ মুসনাদ লিখেছি" (তারীখে বাগদাদ)।
- ২এক জায়গায় সব সনদ
একটি হাদিস প্রথমে সবচেয়ে মজবুত সনদে আনেন, তারপর ঠিক সেখানেই অন্য সনদ ও শব্দের পার্থক্য দেখান। ফলে একটি হাদিসের সব রূপ এক জায়গায় দেখা যায়, বুখারীর মতো ভিন্ন অধ্যায়ে ছড়ানো নয়।
- ৩শব্দের নিখুঁততা
কোন বর্ণনাকারী "হাদ্দাসানা" (আমাদের বলেছেন) আর কে "আখবারানা" (আমাদের জানিয়েছেন) বলেছেন, শব্দের এমন সূক্ষ্ম পার্থক্যও তিনি আলাদা করে লিখেছেন।
- ৪বিশেষজ্ঞকে দেখানো
মাক্কী ইবনু আবদান বলেন, ইমাম মুসলিম গ্রন্থটি আবু যুরআ আর-রাযীকে দেখান; যে হাদিসে তিনি দোষের ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা বাদ দিয়েছেন (সিয়ার, খণ্ড ১২)।
- ৫নীতিমালার ভূমিকা
বইয়ের শুরুতে একটি ভূমিকা (মুকাদ্দিমা) লিখেছেন: কার থেকে হাদিস নেওয়া যায়, মিথ্যা বর্ণনার ভয়াবহতা, সনদ কেন দ্বীনের অংশ। এটি হাদিস যাচাইয়ের প্রথম দিকের লিখিত নীতিগুলোর একটি।
তাঁর গ্রন্থ: সহিহ মুসলিম
সংখ্যা: মুহাম্মাদ ফুআদ আব্দুল বাকীর নম্বরে মূল হাদিস ৩,০৩৩টি (ভূমিকা বাদে); পুনরাবৃত্ত সনদগুলো গুনলে সংখ্যা অনেক বেশি। এই সাইটে সহিহ মুসলিমের নম্বর এই আব্দুল বাকীর নম্বর অনুযায়ী।
অধ্যায়ের নাম: ইমাম মুসলিম নিজে বড় ভাগ (কিতাব) করেছেন, কিন্তু ছোট অধ্যায়ের নাম দেননি। আজকের ছাপা কপিতে যে অধ্যায়ের নাম দেখেন, তা পরে ইমাম নববীসহ ব্যাখ্যাকাররা দিয়েছেন।
বুখারীর সাথে পার্থক্য: বুখারী অধ্যায়ের শিরোনামে ফিকহ দেখান, তাই এক হাদিস বহু জায়গায় আসে; মুসলিম সনদ ও শব্দ এক জায়গায় সাজান, তাই খুঁজে পাওয়া সহজ। অধিকাংশ আলেম সনদের শর্তে বুখারীকে এগিয়ে রাখেন।
তাঁর অন্য বই: আত-তাময়ীয, আল-কুনা ওয়াল আসমা, আল-মুনফারিদাত ওয়াল উহদান।
- সহিহ মুসলিম ৮ জিবরীলের হাদিস: ইসলাম, ঈমান ও ইহসান
- সহিহ মুসলিম ১২ "সে সত্য বলে থাকলে অবশ্যই জান্নাতে যাবে"
- সহিহ মুসলিম ২৬ "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" জেনে যে মারা যায়
- সহিহ মুসলিম ৩৮ "বলো, আমি আল্লাহর উপর ঈমান আনলাম, তারপর অটল থাকো"
- সহিহ মুসলিম ৫৪ সালাম ছড়িয়ে দাও
পরীক্ষা ও শেষ জীবন
২৬১ হিজরির রজব মাসে, রবিবার সন্ধ্যায় তিনি মারা যান, সোমবার নিশাপুরের পাশে নাসরাবাদে দাফন হয় (তারীখে বাগদাদ; সিয়ার, খণ্ড ১২)। জন্মসাল ২০৪ ধরলে বয়স ৫৭, আর আল-হাকিমের মতো ২০৬ ধরলে ৫৫।
আলেমদের চোখে
আলেমরা একমত, কুরআনের পরে সবচেয়ে বিশুদ্ধ কিতাব দুটি সহিহ: বুখারী ও মুসলিম।
ইমাম নববী · নববী, শরহু সহিহ মুসলিমের ভূমিকা
আমাকে আপনার পা চুমু খেতে দিন, হে শিক্ষকদের শিক্ষক, মুহাদ্দিসদের নেতা, হাদিসের দোষ ধরার চিকিৎসক।
ইমাম মুসলিম (বুখারীকে) · আল-হাকিমের সূত্রে তারীখে বাগদাদ; সিয়ার, খণ্ড ১২
জীবনের সময়রেখা
| হিজরি | খ্রিস্টাব্দ | ঘটনা | সূত্র |
|---|---|---|---|
| ২০৪ বা ২০৬ | ৮১৯-৮২১ | নিশাপুরে জন্ম | সিয়ার, খণ্ড ১২ |
| ২১৮ | ৮৩৩ | ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়ার কাছে হাদিস শোনা শুরু | সিয়ার, খণ্ড ১২ |
| ২২০ | ৮৩৫ | হজের সফর, হিজাযে শিক্ষা | সিয়ার, খণ্ড ১২ |
| বছর অজানা | — | পনেরো বছর ধরে সহিহ মুসলিম সংকলন | আহমাদ ইবনু সালামার বর্ণনা, তারীখে বাগদাদ |
| ২৫০ | ৮৬৪ | নিশাপুরে ইমাম বুখারীর সঙ্গ | সিয়ার, খণ্ড ১২ |
| ২৬১ | ৮৭৫ | নিশাপুরে ইন্তেকাল | সিয়ার, খণ্ড ১২ |
প্রচলিত গল্প: কতটা নিশ্চিত
একটি হাদিস খুঁজতে খুঁজতে পাশের ঝুড়ি থেকে এত খেজুর খান যে তাতেই তাঁর মৃত্যু হয়।
মুহাদ্দিসদের নিয়মে সনদ না মিললে গল্পটি যত সুন্দরই হোক, নিশ্চিত তথ্য হিসেবে লেখা হয় না।
সূত্র
- যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা
খণ্ড ১২, পৃ. ৫৫৭ থেকে - খতীব বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ
মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজের জীবনী - ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিমের মুকাদ্দিমা
তাঁর নিজের লেখা নীতিমালা - নববী, আল-মিনহাজ শরহু সহিহ মুসলিম
ভূমিকা অংশ
সিয়ারের খণ্ড ও পৃষ্ঠা মুআসসাসাতুর রিসালাহ সংস্করণ অনুযায়ী। হাদিসের সংখ্যা সংস্করণ ও গণনার ধরনভেদে কিছুটা আলাদা হয়; কোন সংস্করণের সংখ্যা, তা পাশে লেখা। জন্মসাল বা মৃত্যুস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলে দুই মতই দেওয়া হয়েছে। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান, সূত্রসহ সংশোধন করা হবে। আরও দেখুন: সূত্র নীতি।