وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ
শিআবে আবু তালিব: ক্ষুধার তিন বছর
মারধর, লোভ, দূত, কিছুতেই কাজ হলো না। তখন কুরাইশ বেছে নিল সবচেয়ে নিষ্ঠুর পথ: পুরো একটা পরিবারকে না খাইয়ে মারা। তিন বছর এক গিরিপথে আটকে রইলেন নবীজি (ﷺ), তাঁর আত্মীয়রা আর মুসলিমরা।
সীরাত · মক্কী যুগ৬১৬ - ৬১৯ খ্রি. · নবুয়তের ৭ম থেকে ১০ম বছর
- কখন
- নবুয়তের ৭ম বছরের মুহাররম থেকে প্রায় তিন বছর (প্রসিদ্ধ মত)
- কোথায়
- মক্কার পাশে আবু তালিবের গিরিপথ (শিআবে আবু তালিব)
- কারা
- বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব, মুসলিম ও অমুসলিম সবাই (আবু লাহাব ছাড়া)
- এই গল্পে
- বয়কটের চুক্তি থেকে চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলা পর্যন্ত
কেন পড়বেন: অবরোধ, ক্ষুধা, একঘরে হয়ে থাকা: এগুলো আজও পৃথিবীর অনেক মুসলিমের বাস্তবতা। এই গল্প দেখায়, নবীজি (ﷺ) নিজেও এর ভেতর দিয়ে গেছেন, আর অন্ধকারের মধ্যেও কিছু বিবেকবান মানুষ ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়।
গল্প
বর্ণনার ভাষা আমাদের; প্রতিটি তথ্য নিচের সূত্র থেকে। প্রতিটি সূত্রের পাশে তার মান দেওয়া আছে, যাতে বোঝা যায় কোনটি সহিহ হাদিস আর কোনটি সীরাত গ্রন্থের ঐতিহাসিক বর্ণনা।
- ১
নবুয়তের ৭ম বছর
কুরাইশের শেষ অস্ত্র
হামযা আর উমর (রা.) মুসলিম হলেন, হাবশায় নাজ্জাশী মুসলিমদের ফিরিয়ে দিলেন না, ইসলাম ছড়িয়েই চলল। কুরাইশ নেতারা বসে এক চুক্তি করল, যার কথা নবীজি (ﷺ) বহু বছর পরে নিজেই মনে করিয়েছেন:
(বিদায় হজে) কুরবানির দিনের পরদিন মিনায় নবীজি (ﷺ) বললেন: আগামীকাল আমরা নামব বনু কিনানার খাইফে, যেখানে তারা কুফরের উপর শপথ করেছিল। অর্থাৎ মুহাসসাব। ঘটনা ছিল, কুরাইশ ও কিনানা বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিবের বিরুদ্ধে চুক্তি করেছিল: তাদের সাথে বিয়ে-শাদি করবে না, কেনাবেচা করবে না, যতক্ষণ না তারা নবীজিকে (ﷺ) তাদের হাতে তুলে দেয়।
সীরাতের বর্ণনায় আছে, চুক্তিটি লিখে কাবার ভেতরে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে সবাই একে পবিত্র অঙ্গীকার মনে করে।
সূত্রসহিহ বুখারী ১৫৯০ সহিহইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: বয়কটের চুক্তিপত্র ও কাবায় ঝোলানো ঐতিহাসিক বর্ণনা
চুক্তির শর্ত ছিল একটাই: মুহাম্মাদকে (ﷺ) আমাদের হাতে তুলে দাও। পুরো পরিবার না খেয়ে থাকল, কিন্তু কেউ তাঁকে তুলে দিল না।
- ২
মুহাররম, নবুয়তের ৭ম বছর
গিরিপথে বন্দি একটি পরিবার
আবু তালিব বনু হাশিম আর বনু মুত্তালিবকে নিয়ে মক্কার পাশে নিজের গিরিপথে আশ্রয় নিলেন। তাঁদের মধ্যে মুসলিমরা যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন অনেক অমুসলিম আত্মীয়ও, যারা শুধু বংশের টানে ভাতিজাকে ছাড়েনি। ব্যতিক্রম একজন: আবু লাহাব, সে কুরাইশের পক্ষে চলে গেল।
রাতে আবু তালিব নবীজিকে (ﷺ) নিজের বিছানায় শোয়াতেন, পরে কোনো ছেলে বা ভাইকে সেখানে শুইয়ে তাঁকে অন্য জায়গায় সরিয়ে দিতেন, যাতে কেউ রাতের আঁধারে আক্রমণ করলে তিনি নিরাপদ থাকেন।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: শিআবে প্রবেশ, আবু লাহাবের অবস্থান ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা: অবরোধের শুরু ও আবু তালিবের পাহারা ঐতিহাসিক বর্ণনা
যে চাচা ঈমান আনেননি, তিনিও ভাতিজার জন্য নিজের ছেলেকে ঝুঁকিতে রাখতেন। আর যে চাচা খুব কাছের ছিল, সে-ই গেল শত্রুর দলে।
- ৩
অবরোধের দিনগুলো
ক্ষুধার তিন বছর
বাজার বন্ধ, ব্যবসা বন্ধ। মক্কায় কোনো কাফেলা এলে কুরাইশ দাম বাড়িয়ে সব কিনে নিত, যাতে অবরুদ্ধরা কিছু কিনতে না পারে। সীরাতের বর্ণনায় আছে, ক্ষুধায় শিশুদের কান্না গিরিপথের বাইরে থেকেও শোনা যেত, আর মানুষ গাছের পাতা খেয়ে দিন কাটাত।
কিছু দয়ালু আত্মীয় গোপনে খাবার পাঠাত। খাদিজার (রা.) ভাতিজা হাকীম ইবনু হিযাম একবার ফুফুর জন্য গম নিয়ে যাচ্ছিলেন, আবু জাহল পথ আটকাল। আরেকজন এসে বাধা দিলে শেষে খাবার পৌঁছাল। খাদিজা (রা.) এই দিনগুলোতে নিজের সম্পদ উজাড় করে দিয়েছিলেন।
এর মধ্যেও নবীজি (ﷺ) থামেননি। হজের মৌসুমে যখন সবার জন্য নিরাপত্তা থাকত, তিনি বেরিয়ে এসে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকতেন।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: অবরোধের কষ্ট ও হাকীম ইবনু হিযামের খাবার ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: শিআবে আবু তালিবের বিবরণ ঐতিহাসিক বর্ণনা
খাদিজা (রা.) ছিলেন মক্কার ধনী নারী; তিন বছরের অবরোধ শেষে তাঁর সম্পদ প্রায় কিছুই ছিল না। আল্লাহর পথে যা গেছে, তা-ই আসলে থেকে গেছে।
- ৪
নবুয়তের ১০ম বছর
বিবেকের ডাক
তিন বছর পর কুরাইশের ভেতরেই কয়েকজনের বিবেক নড়ে উঠল। হিশাম ইবনু আমর, যিনি গোপনে উটের পিঠে খাবার চাপিয়ে গিরিপথে পাঠিয়ে দিতেন, গেলেন যুহাইর ইবনু আবি উমাইয়ার কাছে, যাঁর মা ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের মেয়ে। বললেন: তুমি খাচ্ছ, পরছ, বিয়ে করছ, আর তোমার মামারা না খেয়ে মরছে?
তাঁরা আরও তিনজনকে সাথে নিলেন: মুতইম ইবনু আদী, আবুল বাখতারী আর যামআ ইবনুল আসওয়াদ। পরদিন সকালে কাবার চত্বরে যুহাইর দাঁড়িয়ে বললেন: হে মক্কাবাসী, আমরা খাব আর পরব, আর বনু হাশিম ধ্বংস হয়ে যাবে? আল্লাহর কসম, এই অন্যায় চুক্তি ছিঁড়ে না ফেলা পর্যন্ত আমি বসব না। আবু জাহল প্রতিবাদ করল, কিন্তু একে একে বাকিরা যুহাইরের পক্ষে দাঁড়ালেন।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: চুক্তি ভাঙার উদ্যোগ (হিশাম ইবনু আমর ও সাথীরা) ঐতিহাসিক বর্ণনা
এঁরা কেউ তখন মুসলিম ছিলেন না। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য প্রথম কাউকে মুখ খুলতে হয়।
- ৫
অবরোধের শেষ দিন
উইপোকা আর একটি নাম
সীরাতের বর্ণনায় আছে, এর আগেই নবীজি (ﷺ) চাচা আবু তালিবকে জানিয়েছিলেন, আল্লাহ চুক্তিপত্রের উপর উইপোকা পাঠিয়েছেন; জুলুম আর আত্মীয়তা ছিন্ন করার সব কথা খেয়ে ফেলেছে, শুধু আল্লাহর নামটুকু বাকি আছে। আবু তালিব কুরাইশের কাছে গিয়ে বললেন: আমার ভাতিজা কখনো মিথ্যা বলেনি; দেখো, যদি সত্য হয়, চুক্তি ভেঙে দাও।
কাবা থেকে চুক্তিপত্র নামিয়ে দেখা গেল, ঠিক তা-ই হয়েছে: "বিসমিকা আল্লাহুম্মা" (তোমার নামে, হে আল্লাহ) ছাড়া বাকি লেখা পোকায় খেয়ে ফেলেছে। এভাবে নবুয়তের দশম বছরে অবরোধ শেষ হলো।
সূত্রইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ: উইপোকায় খাওয়া চুক্তিপত্র ঐতিহাসিক বর্ণনাইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা: বয়কটের সমাপ্তি ঐতিহাসিক বর্ণনা
যে কাগজে জুলুম লেখা ছিল, তা টিকল না; টিকে রইল শুধু আল্লাহর নাম।
- ৬
১০ম হিজরি, বিদায় হজ
বিশ বছর পরে সেই জায়গায়
বহু বছর পরে বিদায় হজে নবীজি (ﷺ) মিনা থেকে ফেরার পথে ঠিক সেই জায়গায় তাঁবু ফেললেন, যেখানে একদিন কুরাইশ তাঁকে না খাইয়ে মারার শপথ করেছিল (সহিহ বুখারী ১৫৯০)। যে মানুষটিকে একদিন একঘরে করা হয়েছিল, সেদিন তাঁর সাথে হজ করছে লাখো মানুষ।
আল্লাহ বলেছেন:
يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ
তারা আল্লাহর নূর ফুৎকারে নেভাতে চায়, আর আল্লাহ্, তিনি তাঁর নূর পূর্ণতাদানকারী, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।
সূত্রসহিহ বুখারী ১৫৯০ সহিহসূরা আস-সাফ ৬১:৮ কুরআন
অবরোধ চিরকাল থাকে না। আল্লাহর ওয়াদা সময় নেয়, কিন্তু অবশ্যই পূরণ হয়।
প্রচলিত কিন্তু প্রমাণিত নয়
এই ঘটনা নিয়ে ওয়াজ আর বইয়ে অনেক কথা ছড়ানো আছে। নিচের কথাগুলোর সূত্র দুর্বল বা নেই; ভালোবাসার জায়গা থেকে বলা হলেও নবীজির (ﷺ) নামে অপ্রমাণিত কথা বলা থেকে সাবধান থাকা জরুরি (সহিহ বুখারী ১১০)।
ভুল বোঝা শিআবে আবু তালিবে ক্ষুধায় নবীজি (ﷺ) পেটে পাথর বেঁধেছিলেন
অবরোধে কষ্ট হয়েছিল ঠিক, কিন্তু পেটে পাথর বাঁধার যে সহিহ বর্ণনা, তা খন্দকের যুদ্ধের সময়ের: পরিখা খোঁড়ার দিনগুলোতে তিন দিন না খেয়ে থাকার সময় (সহিহ বুখারী ৪১০১)। দুটি ঘটনা মিলিয়ে ফেলা ঠিক নয়।
ভুল ধারণা বয়কটে শুধু মুসলিমরা ছিলেন
বয়কট ছিল পুরো বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব গোত্রের বিরুদ্ধে (সহিহ বুখারী ১৫৯০), যাদের অনেকেই তখন মুসলিম নন, যেমন আবু তালিব নিজে। তাঁরা বংশের সম্মানে নবীজিকে (ﷺ) আগলে রেখেছিলেন। আবু লাহাব ছিল একমাত্র ব্যতিক্রম।
এই গল্প থেকে আমার জীবনে
গল্প পড়ার উদ্দেশ্য শুধু জানা নয়, জীবনে আনা। একটি বেছে নিয়ে আজই শুরু করুন; অল্প হলেও নিয়মিত আমল আল্লাহর কাছে প্রিয়।
ক্ষুধার্তকে খাওয়ানো
অবরোধের দিনগুলোতে নবীজির (ﷺ) পরিবার ক্ষুধার কষ্ট জেনেছে। কুরআন ক্ষুধার দিনে খাবার দেওয়াকে বলেছে কঠিন গিরিপথ পার হওয়া।
আজকের কাজ: আজ একজন অভাবী মানুষ বা পরিবারকে এক বেলার খাবার দিন, অথবা কোনো খাদ্য সহায়তায় দান করুন।
সূরা আল-বালাদ ৯০:১৪ কুরআন
অন্যায় দেখে প্রথম মুখ খোলা
হিশাম ইবনু আমর আর যুহাইর একা শুরু করেছিলেন, পরে অন্যরা যোগ দিল। আল্লাহ বলেছেন, ভালো কাজ আর তাকওয়ায় পরস্পরকে সাহায্য করো, পাপ আর জুলুমে নয়।
আজকের কাজ: পরিবার, স্কুল বা অফিসে কাউকে দলবেঁধে একঘরে করা হলে আজ তার পাশে একটা কথা বলুন বা তাকে সঙ্গ দিন।
সূরা আল-মায়িদা ৫:২ কুরআন
বিপদে আত্মীয়ের পাশে
যাঁরা ঈমান আনেননি, তাঁরাও আত্মীয়তার টানে কষ্ট ভাগ করে নিয়েছিলেন। আত্মীয়তা ছিন্ন করার ব্যাপারে আল্লাহ কঠোর সতর্ক করেছেন।
আজকের কাজ: যে আত্মীয় এখন অভাব, অসুখ বা মামলায় কষ্টে আছেন, আজ তাঁর খোঁজ নিন আর সাধ্যমতো সাহায্যের প্রস্তাব দিন।
সূরা মুহাম্মাদ ৪৭:২২ কুরআন
অবরোধের মধ্যেও দাওয়াত
অবরুদ্ধ অবস্থায়ও নবীজি (ﷺ) হজের মৌসুমে বেরিয়ে মানুষকে ডেকেছেন। আল্লাহ তাঁর নূর পূর্ণ করবেনই।
আজকের কাজ: কঠিন সময়েও নিজের ভালো অভ্যাসটা (তিলাওয়াত, দান, দাওয়াত) বন্ধ না করে আজ অল্প হলেও চালু রাখুন।
সূরা আস-সাফ ৬১:৮ কুরআন
তিন বছর না খেয়ে থাকার পরও কেউ নবীজিকে (ﷺ) শত্রুর হাতে তুলে দেয়নি। আজ আপনার দ্বীনের জন্য সামান্য একটা লোকসান, একটু উপহাস বা একটা সুযোগ হারানো, কতটুকু সহ্য করতে আপনি প্রস্তুত?
সূত্রের মান কীভাবে দেখানো হয়েছে
- কুরআন সবচেয়ে নিশ্চিত সূত্র।
- সহিহ হাসান হাদিস বিশারদদের যাচাইয়ে গ্রহণযোগ্য হাদিস; আকীদা ও আমলে দলিল।
- ঐতিহাসিক বর্ণনা ইবনে ইসহাক, ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, তাবারী, ইবনে কাসীরের মতো প্রাচীন সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থের বর্ণনা, যার সনদ নেই বা দুর্বল, কিন্তু কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়; সীরাতবিদরা ইতিহাস হিসেবে নিয়েছেন। এ দিয়ে আকীদা বা বিধান প্রমাণ করা হয় না।
- মান নিয়ে মতভেদ মুহাদ্দিসদের কেউ গ্রহণযোগ্য, কেউ দুর্বল বলেছেন; দুই মতই উল্লেখ করা হয়।
- দুর্বল জাল / ভিত্তিহীন প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়; শুধু সতর্ক করতে উল্লেখ।
সূত্র বাছাইয়ের পুরো নিয়ম: সূত্র নীতি।