ইমাম পরিচিতি · হাদিসের মূল উৎস
ইমাম মালিক
مالك بن أنس
মদিনার ইমাম, মুয়াত্তার সংকলক
আবু আব্দিল্লাহ মালিক ইবনু আনাস ইবনি মালিক ইবনি আবী আমির আল-আসবাহী আল-মাদানী
তিনি সারা জীবন মদিনায় কাটিয়েছেন, সাহাবিদের ছাত্রদের ছাত্রদের কাছে শিখেছেন। তাঁর মুয়াত্তা হাদিসের সবচেয়ে পুরনো সাজানো গ্রন্থগুলোর একটি; ইমাম শাফেয়ী তাঁর ছাত্র।
- জন্ম
- ৯৩ হিজরি (প্রায় ৭১১ খ্রি.)
- জন্মস্থান
- মদিনা · আজকের সৌদি আরব
- মৃত্যু
- রবিউল আউয়াল ১৭৯ হিজরি (৭৯৫ খ্রি.)
- কোথায়
- মদিনা, জান্নাতুল বাকীতে দাফন
- বয়স
- প্রায় ৮৬ বছর
- প্রধান গ্রন্থ
- আল-মুয়াত্তা الموطأ
পরিবার ও শৈশব
তাঁর বংশ ইয়েমেনের আসবাহ গোত্রের। দাদা মালিক ইবনু আবী আমির ছিলেন বড় তাবিঈ (সাহাবিদের ছাত্র), উমার ও উসমান (রা.) থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাই ছোটবেলা থেকেই ঘরে জ্ঞানের চর্চা ছিল। বর্ণিত আছে, তাঁর মা তাঁকে ভালো পোশাক পরিয়ে বলতেন: রাবীআর কাছে যাও, তাঁর জ্ঞানের আগে তাঁর আদব শেখো (কাযী ইয়ায, তারতীবুল মাদারিক)।
শিক্ষা ও জ্ঞানের সফর
অন্য মুহাদ্দিসরা দেশে দেশে সফর করেছেন, কিন্তু ইমাম মালিক হজ ছাড়া মদিনা থেকে বের হননি। কারণ মদিনাতেই ছিলেন সাহাবিদের সন্তান ও ছাত্ররা। তিনি বহু বছর নাফের কাছে বসেছেন, যিনি ইবনু উমার (রা.)-এর সাথে প্রায় ত্রিশ বছর ছিলেন। ইমাম বুখারী বলেছেন, সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ হলো: মালিক, নাফে থেকে, ইবনু উমার থেকে (ইবনুস সালাহ, মুকাদ্দিমা, "সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ" অধ্যায়)। এই সনদকে বলা হয় "সোনার শিকল" (সিলসিলাতুয যাহাব)।
শিক্ষক
- নাফে (ইবনু উমার রা.-এর আযাদকৃত দাস ও ছাত্র)
- ইবনু শিহাব আয-যুহরী
- রাবীআতুর রায়
- ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-আনসারী
- আবুয যিনাদ
- জাফর আস-সাদিক
ছাত্র
- ইমাম শাফেয়ী
- আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক
- আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী
- ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া আল-লাইসী
- আব্দুল্লাহ ইবনু মাসলামা আল-কানাবী
- মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ-শাইবানী
যেভাবে কাজ করেছেন
- ১বেছে নেওয়া
তিনি শুধু নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর কাছ থেকে নিতেন। মদিনায় অনেক নেককার মানুষ ছিলেন, কিন্তু হাদিস মুখস্থে দুর্বল হলে তিনি তাঁদের থেকে বর্ণনা নিতেন না (সিয়ার, খণ্ড ৮এর আলোচনা)।
- ২বিষয় অনুযায়ী সাজানো
মুয়াত্তা ফিকহের অধ্যায়ে সাজানো: পবিত্রতা, নামাজ, যাকাত, রোজা, হজ, বেচাকেনা ইত্যাদি। প্রতিটি অধ্যায়ে আগে নবীজির (ﷺ) হাদিস, তারপর সাহাবিদের কথা, তারপর তাবিঈদের মত, শেষে মদিনার আলেমদের আমল।
- ৩বারবার ছাঁটাই
বহু বছর ধরে তিনি মুয়াত্তা পড়িয়েছেন আর সংশোধন করেছেন। তাই ছাত্রদের কাছে এর অনেকগুলো "রিওয়ায়াত" (বর্ণনা-সংস্করণ) আছে; সবচেয়ে প্রচলিত ইয়াহইয়া ইবনু ইয়াহইয়া আল-লাইসীর বর্ণনা।
- ৪হাদিসের আদব
হাদিস পড়ানোর আগে গোসল করে, সুগন্ধি মেখে, গম্ভীর হয়ে বসতেন; হাদিসকে সম্মান দেখাতেই এমন করতেন বলে তাঁর ছাত্ররা বর্ণনা করেছেন (সিয়ার, খণ্ড ৮)।
তাঁর গ্রন্থ: আল-মুয়াত্তা
আল-মুয়াত্তা অর্থ "সহজ করে সাজানো পথ"। এতে নবীজির (ﷺ) হাদিস ছাড়াও সাহাবিদের কথা, তাবিঈদের ফতোয়া আর ইমাম মালিকের নিজের মত আছে। আবু বকর আল-আবহারীর প্রসিদ্ধ গণনায় মোট প্রায় ১,৭২০টি বর্ণনা: এর মধ্যে মুত্তাসিল (সনদ পুরো) হাদিস ৬০০টি, মুরসাল (সাহাবির নাম বাদ) ২২২টি, সাহাবিদের কথা ৬১৩টি, তাবিঈদের কথা ২৮৫টি।
ইমাম শাফেয়ী বলেছেন: "আল্লাহর কিতাবের পরে পৃথিবীতে মালিকের কিতাবের চেয়ে বিশুদ্ধ কোনো কিতাব নেই।" মনে রাখবেন, কথাটা সহিহ বুখারী ও মুসলিম লেখার আগের (ইবনুস সালাহ, মুকাদ্দিমা, প্রথম অধ্যায়ে এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন)। কিছু আলেম ছয় গ্রন্থের তালিকায় ইবনু মাজাহর জায়গায় মুয়াত্তা রেখেছেন, যেমন ইবনুল আসীর তাঁর জামিউল উসূলে।
পরীক্ষা ও শেষ জীবন
১৪৬ হিজরিতে মদিনার শাসক জাফর ইবনু সুলাইমান তাঁকে চাবুক মারেন, কাঁধের জোড়া সরে যায়। কারণ, তিনি হাদিস বর্ণনা করতেন যে জোর করে নেওয়া তালাক হয় না; শাসকেরা ভয় পেয়েছিলেন, মানুষ এ থেকে বুঝবে জোর করে নেওয়া আনুগত্যের শপথও মানতে হয় না (সিয়ার, খণ্ড ৮)। এরপর তাঁর সম্মান মানুষের কাছে আরও বেড়ে যায়। ১৭৯ হিজরির রবিউল আউয়ালে মদিনায় তিনি মারা যান, বাকীতে দাফন হন।
আলেমদের চোখে
আলেমদের কথা উঠলে মালিক হলেন উজ্জ্বল তারা।
ইমাম শাফেয়ী · সিয়ার, খণ্ড ৮; ইবনু আবী হাতিম, আল-জারহু ওয়াত তাদীল-এর ভূমিকা
সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ: মালিক, নাফে থেকে, ইবনু উমার থেকে।
ইমাম বুখারী · ইবনুস সালাহ, মুকাদ্দিমা
জীবনের সময়রেখা
| হিজরি | খ্রিস্টাব্দ | ঘটনা | সূত্র |
|---|---|---|---|
| ৯৩ | ৭১১ | মদিনায় জন্ম | সিয়ার, খণ্ড ৮ |
| ১১৭-এর আগে | ৭৩৫-এর আগে | নাফে (মৃ. ১১৭), যুহরী ও রাবীআর কাছে শেখা | সিয়ার, খণ্ড ৮ |
| ১৪৬ | ৭৬৩ | শাসকের হাতে চাবুকের শাস্তি | সিয়ার, খণ্ড ৮ |
| ১৭৯ | ৭৯৫ | মদিনায় ইন্তেকাল, বাকীতে দাফন | সিয়ার, খণ্ড ৮ |
প্রচলিত গল্প: কতটা নিশ্চিত
খলিফা মুয়াত্তাকে সব দেশে বাধ্যতামূলক করতে চাইলে ইমাম মালিক রাজি হননি; বলেছিলেন, সাহাবিরা নানা দেশে ছড়িয়ে গেছেন, সবার কাছে কিছু জ্ঞান আছে।
মুহাদ্দিসদের নিয়মে সনদ না মিললে গল্পটি যত সুন্দরই হোক, নিশ্চিত তথ্য হিসেবে লেখা হয় না।
সূত্র
- যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা
খণ্ড ৮, পৃ. ৪৮ থেকে - কাযী ইয়ায, তারতীবুল মাদারিক
ইমাম মালিকের জীবনী অধ্যায় - ইবনু আব্দিল বার, আল-ইনতিকা ফী ফাদাইলিস সালাসাতিল আইম্মাহ
মালিক অংশ - ইবনুস সালাহ, মুকাদ্দিমা (উলূমুল হাদিস)
সবচেয়ে বিশুদ্ধ সনদ ও সবচেয়ে বিশুদ্ধ কিতাবের আলোচনা
সিয়ারের খণ্ড ও পৃষ্ঠা মুআসসাসাতুর রিসালাহ সংস্করণ অনুযায়ী। হাদিসের সংখ্যা সংস্করণ ও গণনার ধরনভেদে কিছুটা আলাদা হয়; কোন সংস্করণের সংখ্যা, তা পাশে লেখা। জন্মসাল বা মৃত্যুস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলে দুই মতই দেওয়া হয়েছে। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান, সূত্রসহ সংশোধন করা হবে। আরও দেখুন: সূত্র নীতি।