deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার

ইমাম পরিচিতি · হাদিসের মূল উৎস

ইমাম আহমাদ

أحمد بن حنبل

আহলুস সুন্নাহর ইমাম, মুসনাদের সংকলক

আবু আব্দিল্লাহ আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনি হাম্বাল আশ-শাইবানী

বাবাকে হারিয়ে মায়ের কাছে বড় হওয়া এক এতিম, যিনি হাদিসের খোঁজে পায়ে হেঁটে ইয়েমেন পর্যন্ত গেছেন, আর "কুরআন সৃষ্ট" এই ভুল মত মেনে না নেওয়ায় জেল ও চাবুক সয়েছেন।

জন্ম
রবিউল আউয়াল ১৬৪ হিজরি (৭৮০ খ্রি.)
জন্মস্থান
বাগদাদ · আজকের ইরাক
মৃত্যু
১২ রবিউল আউয়াল ২৪১ হিজরি, জুমাবার (৮৫৫ খ্রি.)
কোথায়
বাগদাদ
বয়স
৭৭ বছর
প্রধান গ্রন্থ
আল-মুসনাদ المسند

পরিবার ও শৈশব

তাঁর বংশ আরবের শাইবান গোত্রের। পরিবার খোরাসানের মার্ভ শহর থেকে বাগদাদে আসে; মা তাঁকে গর্ভে নিয়ে বাগদাদে আসেন, সেখানেই জন্ম (ছেলে সালিহের বর্ণনা, সিয়ার, খণ্ড ১১)। বাবা মুহাম্মাদ মাত্র ত্রিশ বছর বয়সে মারা যান, তাই মা-ই তাঁকে বড় করেন। পরিবারের সামান্য সম্পত্তির ভাড়ায় সারা জীবন সাদামাটা চলেছেন, শাসকদের উপহার নিতেন না।

শিক্ষা ও জ্ঞানের সফর

১৭৯ হিজরিতে, ষোলো বছর বয়সে, তিনি হাদিস শেখা শুরু করেন, প্রথম শিক্ষক হুশাইম (সিয়ার, খণ্ড ১১)। এরপর কূফা, বসরা, মক্কা, মদিনা, ইয়েমেন, শাম ও জাযীরায় সফর করেছেন। ইয়াহইয়া ইবনু মাঈনের সাথে ইয়েমেনের সানআয় আব্দুর রাযযাকের কাছে গেছেন। মক্কায় ইমাম শাফেয়ীর সাথে পরিচয়, পরে বাগদাদে তাঁর কাছে ফিকহ শিখেছেন। ইমাম শাফেয়ী বলেছেন: "আমি বাগদাদ ছেড়ে এলাম, সেখানে আহমাদের চেয়ে বড় ফকীহ, পরহেযগার ও আলেম কাউকে রেখে আসিনি" (তারীখে বাগদাদ; সিয়ার, খণ্ড ১১)।

শিক্ষক

  • হুশাইম ইবনু বাশীর (প্রথম শিক্ষক)
  • সুফিয়ান ইবনু উয়াইনা
  • ইয়াহইয়া ইবনু সাঈদ আল-কাত্তান
  • আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী
  • ওয়াকী ইবনুল জাররাহ
  • ইমাম শাফেয়ী
  • আব্দুর রাযযাক (সানআ, ইয়েমেন)

ছাত্র

  • ইমাম বুখারী
  • ইমাম মুসলিম
  • ইমাম আবু দাউদ
  • ছেলে সালিহ ও আব্দুল্লাহ
  • আবু যুরআ আর-রাযী

যেভাবে কাজ করেছেন

  1. ১
    সাহাবি অনুযায়ী সাজানো

    "মুসনাদ" মানে প্রতিটি সাহাবির হাদিস তাঁর নামের নিচে এক জায়গায়: আগে দশজন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবি, তারপর আহলে বাইত, তারপর অন্য সাহাবিরা।

  2. ২
    লিখে রাখা

    তিনি মুখস্থ বিদ্যার পাশাপাশি সব কিছু লিখে রাখতেন, আর বই দেখে পড়াতেন, যাতে ভুল না হয়।

  3. ৩
    ছেলেকে দায়িত্ব

    জীবনের শেষ দিকে মুসনাদ ছেলে আব্দুল্লাহ ও পরিবারকে পড়িয়ে যান। আব্দুল্লাহ এতে কিছু হাদিস যোগ করেন (যাওয়াইদ), পরে আল-কাতীঈ তা পৌঁছে দেন।

  4. ৪
    বর্ণনাকারী যাচাই

    তিনি বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে রায় দিতেন; তাঁর এই মতামত ছেলেদের ও ছাত্রদের প্রশ্নোত্তরে (আল-ইলাল ওয়া মারিফাতুর রিজাল) সংরক্ষিত।

তাঁর গ্রন্থ: আল-মুসনাদ

আল-মুসনাদ হাদিসের সবচেয়ে বড় গ্রন্থগুলোর একটি। শুআইব আল-আরনাঊতের তত্ত্বাবধানে মুআসসাসাতুর রিসালাহর সংস্করণে (৫০ খণ্ড) পুনরাবৃত্তিসহ প্রায় ২৭,০০০ বর্ণনা নম্বর দেওয়া আছে।

এতে সহিহ, হাসান আর দুর্বল সব ধরনের হাদিস আছে। ইবনুল জাওযী কয়েকটিকে জাল বলেছিলেন; ইবনু হাজার "আল-কাওলুল মুসাদ্দাদ" বইয়ে সেগুলোর বেশিরভাগের পক্ষে জবাব দিয়েছেন। তাই মুসনাদের হাদিস দলিল হিসেবে নেওয়ার আগে প্রতিটির আলাদা মান দেখতে হয়। এই সাইটে মুসনাদের কোনো হাদিস নিলে আরনাঊতের মানসহ দেওয়া হয়।

পরীক্ষা ও শেষ জীবন

মিহনা (পরীক্ষা): ২১৮ হিজরিতে খলিফা মামুন আলেমদের বাধ্য করেন বলতে যে কুরআন "সৃষ্ট"। ইমাম আহমাদ রাজি হননি; বলতেন, কুরআন আল্লাহর কালাম, সৃষ্ট নয়। তাঁকে শিকল পরিয়ে মামুনের কাছে নেওয়ার পথেই মামুন মারা যান। পরের খলিফা মুতাসিমের সময় তিনি প্রায় আড়াই বছর বন্দি ছিলেন, তাঁকে চাবুক মারা হয়। খলিফা মুতাওয়াক্কিল এই পরীক্ষা বন্ধ করেন (সিয়ার, খণ্ড ১১; ছেলে সালিহের "সীরাতুল ইমাম আহমাদ" ও চাচাতো ভাই হাম্বালের "যিকরু মিহনাতিল ইমাম আহমাদ")।

২৪১ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল, জুমাবার, বাগদাদে তিনি মারা যান। তাঁর জানাজায় এত মানুষ হয়েছিল যে ইতিহাসবিদরা আলাদা করে তা লিখে রেখেছেন (সিয়ার, খণ্ড ১১)।

আলেমদের চোখে

বাগদাদ ছেড়ে এলাম, সেখানে আহমাদের চেয়ে বড় ফকীহ, পরহেযগার, দুনিয়াবিমুখ ও আলেম কাউকে রেখে আসিনি।

ইমাম শাফেয়ী · তারীখে বাগদাদ; সিয়ার, খণ্ড ১১

রিদ্দার দিনে আবু বকর আর মিহনার দিনে আহমাদ ইবনু হাম্বালের মাধ্যমে আল্লাহ এই দ্বীনকে সম্মান দিয়েছেন।

আলী ইবনুল মাদীনী · তারীখে বাগদাদ; সিয়ার, খণ্ড ১১

জীবনের সময়রেখা

হিজরিখ্রিস্টাব্দঘটনাসূত্র
১৬৪৭৮০বাগদাদে জন্মসিয়ার, খণ্ড ১১
১৭৯৭৯৫হুশাইমের কাছে হাদিস শেখা শুরুসিয়ার, খণ্ড ১১
১৯০-এর দশক৮১০-এর দশকইয়েমেনে আব্দুর রাযযাকের কাছে সফরসিয়ার, খণ্ড ১১
২১৮৮৩৩মিহনা শুরু; মামুনের কাছে নেওয়ার পথে মামুনের মৃত্যুসিয়ার, খণ্ড ১১
২১৯-২২১৮৩৪-৮৩৬মুতাসিমের সময় বন্দি ও চাবুকসিয়ার, খণ্ড ১১
২৪১৮৫৫বাগদাদে ইন্তেকালসিয়ার, খণ্ড ১১

প্রচলিত গল্প: কতটা নিশ্চিত

ভুল বোঝা কথা

"মুসনাদে যা নেই, তা হাদিসই নয়": ইমাম আহমাদের নামে এমন কথা প্রচলিত।

যা জানা যায়: তাঁর ছেলের সূত্রে এমন ধরনের একটি কথা বর্ণিত আছে, কিন্তু যাহাবী ও অন্যরা স্পষ্ট বলেছেন, বুখারী-মুসলিমে এমন সহিহ হাদিস আছে যা মুসনাদে নেই। তাই কথাটা সাধারণ নিয়ম হিসেবে ধরা যাবে না (সিয়ার, খণ্ড ১১এর আলোচনা)।

মুহাদ্দিসদের নিয়মে সনদ না মিললে গল্পটি যত সুন্দরই হোক, নিশ্চিত তথ্য হিসেবে লেখা হয় না।

সূত্র

  1. যাহাবী, সিয়ারু আলামিন নুবালা
    খণ্ড ১১, পৃ. ১৭৭ থেকে (খুব বিস্তারিত জীবনী)
  2. সালিহ ইবনু আহমাদ, সীরাতুল ইমাম আহমাদ
    ছেলের লেখা জীবনী, মিহনার প্রত্যক্ষ বিবরণ
  3. হাম্বাল ইবনু ইসহাক, যিকরু মিহনাতিল ইমাম আহমাদ
    চাচাতো ভাইয়ের প্রত্যক্ষ বিবরণ
  4. খতীব বাগদাদী, তারীখে বাগদাদ
    আহমাদ ইবনু হাম্বালের জীবনী
  5. ইবনুল জাওযী, মানাকিবুল ইমাম আহমাদ
    জীবনী ও গুণাবলি

সিয়ারের খণ্ড ও পৃষ্ঠা মুআসসাসাতুর রিসালাহ সংস্করণ অনুযায়ী। হাদিসের সংখ্যা সংস্করণ ও গণনার ধরনভেদে কিছুটা আলাদা হয়; কোন সংস্করণের সংখ্যা, তা পাশে লেখা। জন্মসাল বা মৃত্যুস্থান নিয়ে মতভেদ থাকলে দুই মতই দেওয়া হয়েছে। কোনো ভুল চোখে পড়লে জানান, সূত্রসহ সংশোধন করা হবে। আরও দেখুন: সূত্র নীতি।

deenpedia.com · https://deenpedia.com/sutro/imam/ahmad/
deenpediaকুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার
deenpedia.com · কুরআন ও সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য পাঠাগার